আজ ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

কিশোরগঞ্জের ইসলাম ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী আলহাজ্ব মাজাহারুল ইসলাম কিরণ এর অজানা স্বপ্নের কাহিনী !!

নিউজক্যাসেল ডেস্কঃ মানবতার প্রতীক আলহাজ মাজারুল ইসলাম কিরণ এভাবে ইসলাম ট্রেডার্সের পরিবার তথা দেশ-সমাজ ও জাতিকে কাঁদিয়ে তিনি না ফেরার দেশে চলে যাবেন সেটা কী কেউ ভাবতো ?
অসুখ-বিসুখ নিয়েও অনেক কর্মবীরকে দেখা গেছে দীর্ঘ জীবন লাভ করতে। ওনার হার্ট-কিডনী ও ডায়াবেটিসে ভূগছিলেন সত্য কিন্তু ৫৩ বছর বয়সে পরপারে চলে যাবেন এমন সম্ভাবনায় তিনি ছিলেন না ।

অসুস্থতা নিয়েও তিনি বহু প্রতিষ্ঠান চালিয়েছেন অতি ধীরতায় ও সুস্থতায়। শরীরে মৃত্যুরোগের উপস্থিতি সত্ত্বেও যেন তিনি প্রতিষ্ঠান চালিয়েছেন লৌহ মানবের ন্যায়। মনে হয়েছে তার দেহে কোনো ব্যাধি নেই। যে সব প্রতিষ্ঠান চালাতেন তার কাঠামো ক্ষুদ্র ছিলনা। যার দৌড়ঝাঁপ ছিল কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা। এমনকী ঢাকা থেকে বিশ্বে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভাবতে হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও। ওনি পরিচিতি পেয়েছিলেন দেশ হতে দেশান্তরেও। কিশোরগঞ্জে যেসব প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্সের আওতায় পরিচালিত হয়ে লোকমুখে খ্যাত ছিল সেসব গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ ১। আজহার ভবন ২।আজহার মটরস ৩। বিকাশ লিমিটেড ৪।ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো কোং বাংলাদেশ লিমিটেড ৫। গোল্ড ক্যাসেল ৬। কার ক্যাসেল ৭। মেরিকো লিমিটেড ইত্যাদি ।

এসব প্রতিষ্ঠানের বাইরেও আজহারুল ইসলাম কিরণ পেশাগত রুচির ওল্টোতে আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। সেই প্রতিষ্ঠান যদি সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের মতো কিছু হয় তাহলে কী অবাক হবেন? হ্যাঁ অবাক হবারই কথা। তিনি সবাইকে ধাধাঁ লাগিয়ে এমন সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন এক বছর আগে। এ বিষয়ে দায়িত্ব দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের আরেক লড়াকো সৈনিক রেজাউল হাবীব রেজাকে। যিনি স্বাধীনতাবিরোধীদের আতংক। তিনি আতংক ছিলেন অপসাংবাদিকের জন্যও। এমন ব্যক্তিকে তিনি কেমন করে খুঁজে বের করতে পারলেন সেটাই এক আশ্চর্যের বিষয়ই বটে। কারণ তিনি এ লাইনের লোক নন। তিনি শুধু ব্যবসাকেই চেনার কথা। যা হোক ওনার সেই আশ্চর্যের মিডিয়ার নাম হলো *নিউজক্যাসেল বিডি ডট*। এ নাম ওনার নিজের দেয়া। চেষ্টা করেও অন্য নাম দেয়া যায়নি। শুরুটা এক বছর আগের। তিনি বলছিলেন “এই অনলাইন পোর্টালের কিশোরগঞ্জে এমন একটি অফিস করবেন যা কেউ করেনি। জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা নামক ঢাকা কেন্দ্রীক সংগঠনকে করবেন অতি শক্তিশালী। নিজস্ব ভবনে করবেন এর দৃষ্টিনন্দন কার্যালয়। এখান থেকে তৈরি হবে সাচ্চা সাংবাদিক। উপজেলায় থাকবে এর শাখা- প্রশাখা। এ কার্যালয়ে আরো ১০ টি অনলাইন পোর্টালের সংবাদকর্মীদের সংযোগস্থল হবে এখানে। আর নিউজক্যাসেল অনলাইনে যারা কাজ করবে তারা সবাই থাকবে বেতনভুক্ত। উন্নতমানের ক্যামেরা,উন্নতপ্রযুক্তির ল্যাপটপ,সাংবাদিক বান্ধব পোষাক ও গাড়ী মহড়ায় এক ধরনের তথ্যবীরের ট্রেনিং হবে এখানে। আরো কত কী স্বপ্নের নীল আকাশে ভেসে বেড়াতেন তিনি। আসলেই কী তিনি এমন ভাবতেন, এ ভাবনা কী সহজ ছিল? আমরা কী করে বলবো যে তিনি এসব ভাবার লোক ? আবার তাও চিন্তা করি ‘তিনি যদি এসব নাই ভাবেন তাহলে এক বছর আগে নিউজক্যাসেল অনলাইন পোর্টালটি চালু করলেন কী করে?’ এটা তো এখন পর্যন্ত চালু আছে। যার পরিচালনার ভুমিকায় আছেন রেজাউল হাবীব রেজা। তিনি যদি এটা নাই ভাবতেন তাহলে ২০১৯ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর ওনার নিজ পছন্দের সাংবাদিকদেরকে ক্যাসেল সালামে ডেকে আপ্যায়ন করালেন কেন? আর কেনইবা তার জন্ম দেয়া নিউজক্যাসেলের অগ্রযাত্রায় সবার সহযোগিতা চাইলেন ?

ভারী দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে যে, তিনি এসব স্বপ্ন দেখানোর পর থেকেই তার হার্ট-কিডনী ও ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়ছিলো। তিনি রেজাউল হাবীব রেজাকে এই বলে শান্তনা দিতেন যে, “নিউজপোর্টালের কাজ চালিয়ে যান নিজ দায়িত্বে। দুদিন আগপাছ এ স্বপ্ন বৃথা যাবে না। আর আল্লাহ না করুক আমি যদি না থাকি তাহলে আপনাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছি তা আমার পরবর্তীতে যারা থাকবে তারা এর হাল ধরতে পারে। তিনি আরো বলতেন আমার কথাগুলো কেউ শুনতে না পারলেও নিউজপোর্টাল প্রতিষ্ঠা করে তথ্য মন্ত্রনালয়ে আবেদন করে এর সাক্ষী রেখে গেলাম। তিনি আরো বললেন যে, আমার ভাগ্নে ইবনে আবদুল্লাহ মাজিদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। সে এই পত্রিকার একজন সাক্ষী বটে।” আরো বলতেন যে “হাজী আবু সাইদ নামে আরেকজন যিনি আছেন তাকে বলবেন প্রত্যহ নিউজ করে যেতে। সময়ে এর পারিশ্রমিক দেয়া হবে।” এসব অনেক কথার বাস্তবায়ন হবার আগেই তিনি চির বিদায় নিলেন। এতে শক্ত আঘাত পেল যারা প্রতিনিয়ত নিউজক্যাসেলে বছর ব্যাপী ওনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে গেলেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যারা আছেন তারা দুঃখ পেলেও যারা আশায় আশায় কাজ করেছে তাদের দুঃখের সমান হবে না। এমন স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ওনার মৃত্যুর পর এই নিউজক্যাসেল পোর্টালের হাল ধরার মতো কেউ আছে কী? মাজাহারুল ইসলাম কিরণের এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা কী? কথা ছিল ১২ জুলাই হবে বর্ষপূর্তি। কিন্ত এর কান্ডারী বেঁচে নেই; কে করবে এই নিউজপোর্টালের বর্ষপূর্তি ?

এসব নানা স্বপ্ন দেখিয়ে ও হাজারো হতাশাব্যঞ্জক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গত ২১ জুন ২০২০ তারিখ রবিবার ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে বিকেল সাড়ে ৩ ঘটিকায় না ফেরার দেশে তিনি চলে গেলেন। স্বপ্নের বাতি নিভে গেল এক নিমিষেই।
বিদায়কালে তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী ও দুই কন্যা। ইসলাম ট্রেডার্সের হাল ধরতে রেখে গেছেন তার দুই ভাই। জহিরুল ইসলাম মুবিন ও আমিনুল ইসলাম প্রিন্সকে। এই স্বপ্নচারীর মরদেহকে দেখতে অজস্র মানুষের চেষ্টা। লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মরহুমের নিজ এলাকা হোসেনপুরে। কিন্তু বাঁধ সাধে ঘাতক করোনার ভয়। তবু যে উপচে পড়া মানুষের ভীড়। সেখানে এস.আর.ডি. কলেজ মাঠে সকাল ১০ ঘটিকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা ।

তারপর নিয়ে আসা হয় তার নানা ব্যবসাস্থল প্রাণের শহরে অর্থাৎ কিশোরগঞ্জে। এখানে ব্যবসায়ী মহলে নেমে আসে শোকের ছায়া। বাদ যোহর শহীদী মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় জানাজার দ্বিতীয় জামাত। শহরের সর্বস্তরের জনতা আকুতি জানায় তাকে এক নজর দেখতে। এখানেও করোনার বাঁধা। তদুপরি বিশিষ্টজনরা জীবনের শেষ দেখা দেখলেন নয়ন ভরে। শেষে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে মরদেহ সমাহিত করা হল কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ এলাকার নূরানী গোরস্তানে ।

আসলে এই ক্ষণজন্মা পুরুষ জগতে কমই জন্ম হয়। তিনি প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে দানের হাত উন্মুক্ত রাখতেন। ব্যবহার ছিল অমায়িক। প্রতিষ্ঠান চালানোর দক্ষতা ছিল বলাবাহুল্য। স্বপ্ন ছিল আকাশ সমান। আল্লাহ যেন তার সমস্ত গুণাহখাতা মাফ করে দেন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। এই কামনাই আহাজারি করছে জানাজায় যারা আসতে পারেনি এমন আধাঁরে থাকা লাখো মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     একই ক্যাটাগরিতে আরো সংবাদ