কনস্ট্রাকশন জগতের অগ্রদূত হাজী আবদুল মোনেমের আজ ১ম মৃত্যুবার্ষিকী

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতিসন্তান মোনেমের পিতার নাম মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ ও মাতা হোসনা বানু। হোসনা বানু ছিলেন জেলার আখাউড়া উপজেলার নূরপুর (সাবেক হিরাপুর) গ্রামের ইমাম উদ্দিন মুন্সির ছেলে সফি উদ্দিন ভূইয়ার কন্যা। আবদুল মোনেমকে ছোট বেলায় ছালু মিয়া নামে ডাকা হতো।আবদুল মোনেমের পূর্বপুরুষ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার মানুষ। নবীনগর উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত বড়াইল ইউনিয়নের অধিবাসী ছিলেন তারা।
বড়াইল ইউনিয়নটি বর্তমানে উপজেলার এক নম্বর ইউনিয়ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা ও আশুগঞ্জ উপজেলার সীমানা লাগোয়া বড়াইল ইউনিয়নের পশ্চিমে কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন, দক্ষিণে তিতাস নদী ও বিদ্যাকুট ইউনিয়ন, পুবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়ন এবং উত্তরে রয়েছে আশুগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারুয়া ইউনিয়ন ও শরীফপুর ইউনিয়ন।
বড়াইল ইউনিয়নের গ্রামগুলো হলো- বড়াইল, খারঘর, জালশুকা, মেরাতলী, গোসাইপুর, চরগোসাইপুর, রাধানগর, ঘিয়ারা ও ধোপাচং।
বড়াইল গ্রামের সফর আলী মুন্সির ছিল তিন ছেলে। তারা হলেন ওমেদ আলী মুন্সি, বাবর আলী মুন্সি ও তাজউদ্দিন মুন্সি।
☸️ ওমেদ আলী মুন্সি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার রামরাইল ইউনিয়নের বিজেশ্বর গ্রামের আড়াই খন্দকারের এক মেয়ের সাথে সফর আলী মুন্সির জ্যেষ্ঠপুত্র ওমেদ আলী মুন্সির বিয়ে হয়। বিয়ের পর ওমেদ আলী মুন্সি বিজেশ্বর গ্রামেই জমি ক্রয়ের পর গৃহনির্মাণ করে সেখানে বসবাস করা আরম্ভ করেন।
আসমত আলী ও মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ নামে দু’ছেলে রেখে ওমেদ আলী মুন্সি পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন।
☸️ বাবর আলী মুন্সি:
সফর আলী মুন্সির দ্বিতীয় পুত্র বাবর আলী মুন্সি বড়াইল গ্রামেই বসবাস করেন। বাবর আলী মুন্সির ছিল দু’ছেলে- দেওয়ান কাজী ও আবুল হোসেন। দেওয়ান কাজীর পুত্র আবু সোলায়মান তার সন্তান সন্ততি নিয়ে পৈতৃক ভিটায় বসবাস কায়েম করেছিলেন।
☸️ তাজউদ্দিন মুন্সি:
নবীনগরের বড়াইল গ্রাম ছেড়ে তাজউদ্দিন মুন্সি সিলেটে চলে যান। সেখানকার বাইশ টিলা নামক স্থানে গিয়ে নিজবসতি কায়েম করেন। বিজেশ্বর গ্রামে বসবাসকালে ওমেদ আলীর দু’ছেলে জন্ম গ্রহণ করে।
তারা হলেন আসমত আলী ও মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ। মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের জীবদ্দশায় তার বড় ভাই আসমত আলী মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে আসমত আলী চার ছেলে রেখে যান। তার ছেলেরা হলেন, ১. সুরুজ মিয়া, ২. চাঁন মিয়া, ৩. মোনেমের জন্খউড়ার হীরাপুর(বর্তমান নূরপুর) গ্রামের ইমাম উদ্দিন মুন্সির ছেলে সফি উদ্দিন ভূঁইয়ার কন্যা মোসাম্মৎ হোসনা বানুর সাথে মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মোসাম্মৎ হোসনা বানুর মাতা ছিলেন এতিমুন্নেসা বেগম। বিবাহের কিছুদিন পর মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ তার স্ত্রী মোসাম্মৎ হোসনা বানুকে নিয়ে নিজ কর্মস্থল কলকাতায় চলে যান।
মোসাম্মৎ হোসনা বানু কলকাতায় অবস্থানকালে গর্ভধারণ করার পর সন্তান প্রসবের আগে তিনি কলকাতা থেকে চলে আসেন পিত্রালয় আখাউড়ার নূরপুরে। নির্ধারিত সময়ে নূরপুরে ১৯৩৭ সালের ৫ই জানুয়ারি তার এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে।
নবজাত সন্তানের নাম রাখা হয় আবদুল মোনেম। তার ডাক নাম রাখা হয় ছালু মিয়া।
মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের মৃত্যু:
মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ কলকাতায় তাঁর কর্মস্থলে অবস্থান কালে হঠাৎ রোগাক্রান্ত হয়ে ১৯৩৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বরে আনা হয়নি।
মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের সহকর্মীদের ইচ্ছায় তাকে কলকাতায় শিক্ষাগ্রহণ করা তার মাদরাসার মসজিদ প্রাঙ্গণের গোরস্থানে সম্মানের সহিত সমাহিত করা হয়।
মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার একমাত্র ছেলে আবদুল মোনেমের বয়স এক বছরও পূর্ণ হয়নি। যুবতী স্ত্রী মোসাম্মৎ হোসনা বানু তার শিশুপুত্র আবদুল মোনেমকে নিয়ে বাবার বাড়ি আখাউড়ার নূরপুরেই অবস্থান করেন। তিনি তার স্বামীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বরে আসেননি।
বিধবা যুবতী হোসনা বানুর জীবন সংগ্রাম:
বয়সে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বিধবা হওয়ার পর তার বোনেরা ও ভাইয়েরা হোসনা বানুকে আবার বিয়ের জন্য চাপ দেন। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে একমাত্র শিশুপুত্রকে নিয়েই জীবন কাটানোর জন্য তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
প্রতিজ্ঞা করেন এই শিশুপুত্রকে যেমন করেই হোক তিনি মানুষ করবেন। এই পিতৃহারা শিশু আবদুল মোনেম যেন বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হয়ে পিতা মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের নাম ধরে রাখার যোগ্য হয় সেদিকেই হোসনা বানু মনোনিবেশ করেন।
নিজের আরাম আয়েশের দিকে নজর দিলে হয়তো বিয়ে করে সুখ ও শান্তি পেতে পারেন কিন্তু এই শিশুসন্তানের ভবিষ্যত দেখবে কে?
একমাত্র শিশু মোনেমের জন্য তিনি তার সকল সুখ ও আয়েশ ত্যাগ করার সিদ্ধান্তে তিনি অটল থাকার বিষয়ে জেদ ধরলেন। ভাই ও বোনদের সুপরামর্শে তিনি সায় দিতে পারলেন না।
তারপরও তার ভাইয়েরা তাকে এই একান্ত ও কঠিন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বিবাহ করার জন্য চাপ দিতেই থাকেন।
এতে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। স্বামীর ভিটেয় গিয়ে বসবাসের সুযোগ থাকার পরেও তিনি ভাইদের থেকে পৃথক হয়ে নূরপুরেই পিতার বাড়িতেই একটি আলাদা ঘর তৈরি করে ছেলেকে নিয়ে বসবাস করা আরম্ভ করেন। শুরু হয় নূরপুরে তার সংগ্রাম মুখর কঠিন জীবন।
কঠিন সংগ্রামী জীবনের সূচনা:
তখনকার দিনে পল্লীগ্রামে মহিলাদের কর্মসংস্থান তেমন সুযোগ ছিল না। তখন গ্রামের প্রায় সকলেই কৃষক। পুরো বর্ষাকাল মানুষ থাকে কর্মহীন।
কৃষকের জমিতে তখন ধান,পাট, চিনা, কাউন, মিষ্টি আলু, তেলবীজ, ডাল ইত্যাদি প্রধান প্রধান ফসল উৎপাদন হতো।
ধান থেকে চাউল করার জন্য তখনকার দিনে প্রধান উপায় ছিল ঢেঁকিতে ধান ভানা বা ছাটাই করা। সে সময়ে গ্রামাঞ্চলে চালকলের প্রচলন হয়নি। ঢেঁকি ব্যতিরেকে গাইল-ছিয়ার মাধ্যমেও মহিলারা বাড়ি বাড়ি ধান ভানার কাজ করতেন।
মহিলা শ্রমিকদের ধান ভানার নিয়ম ছিল বড় কৃষকের বাড়ি থেকে ধান এনে তা চাউল করে ফেরত দিতে হত।
ধান থেকে চাউল করার বিনিময়ে শ্রমিককে শ্রমের মূল্য পরিশোধ করার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় চাউল দিয়েই শ্রমিককে তার শ্রমের মজুরি পরিশোধ করতো। এ প্রথাকে বলা হতো ‘ভারকি ভানা’।
পাটের আঁশ ছাড়িয়ে বর্ষাকালে কিছু উপার্জন করা যেত। গ্রামাঞ্চলের গরীব মহিলাদের ক্ষেত্রে কায়িক পরিশ্রম করে এসব উপায়ে রোজগার করার কিছু সুযোগ ছিল। আরও ছিল গরু ছাগল ভাগীতে পালন করা।
এ নিয়মে মালিক তাদের গরু ছাগল ফেরত নিলে পালনকারীকে কিছু টাকা দিয়ে যেতো। বুদ্ধিমতি রমনী হোসনা বানু কারও উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের কায়িক শ্রমের মাধ্যমে উপার্জনে চলার কাজে নিয়োজিত হওয়া সম্মানের পেশা হিসাবে বেছে নিলেন।
শুরু হয় তার নিজের শ্রমে সংসার পরিচালনার কঠিন জীবন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি যা আয় করতেন তা দিয়ে মা ও ছেলের জীবন নির্বিঘ্নেই চলে যেতো।
হোসনা বানু তার ভাইদের সহায় সম্পত্তি থেকে কিছুই নেননি বা গ্রহণ করেননি। তার প্রাপ্য পৈতৃক সম্পত্তি তিনি তার ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দেন, নিজে কিছুই নেননি। বরং ভাইয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েদেরকে ভরণপোষণ করেছেন হোসনা বানু।
আবদুল মোনেমের শিক্ষা গ্রহণ:
মা হোসনা বানুর ছত্রছায়ায় হিরাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবদুল মোনেম ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। প্রয়াত মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের একমাত্র ছেলে বড় হয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এই সংবাদ অবহিত হয়ে আবদুল ওয়াহেদের বন্ধু বর্তমান গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার গজনবী নামে জনৈক ব্যক্তি তার সহায়তায় এগিয়ে আসেন।
তিনি হোসনা বানুর নামে আবদুল মোনেমের লেখাপড়ার খরচ নির্বাহের জন্য পোস্ট অফিসের মাধ্যমে মনি অর্ডার যোগে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়ে দেন। আবদুল মোনেমের লেখাপড়ার জন্য গজনবী সাহেবের টাকা পাঠানোর বিষয়টি হোসনা বানুর পছন্দ হয়নি।
আবদুল মোনেমের লেখাপড়ার খরচ তিনি নিজেই চালিয়ে নিচ্ছিলেন। গজনবী সাহেবের প্রেরিত টাকা তিনি মোনেমের লেখাপড়ায় খরচ করেননি।
চেয়েছিলেন গজনবী সাহেবের টাকা ফেরত দিবেন কিন্তু টাকাটা ফেরত দেওয়া শোভনীয় হবে না বিধায় সেদিকে তিনি আর যাননি। তবে আর কোন টাকা না পাঠানোর জন্য তিনি গজনবী সাহেবকে অনুরোধ করে চিঠি পাঠান।
গজনবী সাহেবের প্রেরিত টাকা দিয়ে হিরাপুর গ্রামে কিছু কৃষি জমি ক্রয় করে রাখেন। বড় হয়ে হিরাপুরে জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সময় আবদুল মোনেম তার মায়ের কেনা কৃষি জমিগুলি দান করে দিয়েছেন।
হিরাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ হলে হোসনা বানু আবদুল মোনেমকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অন্নদা হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন।
আবদুল মোনেমের লেখাপড়ার সুবিধার জন্য হোসনা বানু আখাউড়ার হিরাপুর গ্রাম থেকে স্বামীর ভিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাছাকাছি রামরাইল ইউনিয়নের বিজেশ্বর গ্রামে চলে আসেন।
জীবদ্দশায় মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ তার পৈতৃক বাড়ি থেকে সরে একটু দূরে গিয়ে নিজের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন।
মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ নতুন বাড়িতে আসার সময় তার প্রয়াত বড় ভাই আসমত আলীর চার সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন।
স্বামীর বাড়ি উদ্ধারে মামলার আশ্রয় গ্রহণ:
হোসনা বানু যখন তার স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসেন তখন আসমত আলীর ছেলেরা বাড়ির অর্ধেক জমি দখল করে রাখে। হোসনা বানু অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেন না, সহ্যও করতেন না।
বাড়ির জমি দখলমুক্ত করতে বাধ্য হয়ে তাকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। আবদুল মোনেমের মামা আখাউড়ার হিরাপুরের হাজী আবুল হাসেম দীর্ঘদিন হোসনা বানুর পক্ষে কুমিল্লা আদালতে মামলা পরিচালনা করেন।
মামলার কারণে আখাউড়া থেকে কুমিল্লা আদালতে আসা-যাওয়া করতে হাজী আবুল হাসেমের বেশ কষ্ট স্বীকার করতে হয়। দীর্ঘদিন মামলা চলার পরে মামলার রায় হোসনা বানুর পক্ষেই আসে।
মানবতার কারণে হোসনা বানু ও আবদুল মোনেম বাড়ির অর্ধেক অংশ মোনেমের চাচাতো ভাইদের দিয়ে দেন। অবশিষ্ট অর্ধেক অংশে একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে হোসনা বানু আবদুল মোনেমকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বিজেশ্বরে বসবাস করে ছেলেকে লেখাপড়া করাতে থাকেন।
আবদুল মোনেমের শিক্ষা লাভ:
আবদুল মোনেম কৃতীত্বের সাথে অন্নদা হাই স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৫৪সালে ইন্টামেডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার কিছুদিন আগে আবদুল মোনেমের জীবনে আরেক বিপত্তি ঘটে। শিক্ষা জীবন ছেড়ে
ঢাকায় আগমন:
বিজেশ্বর গ্রামের জনৈক ব্যক্তি তারই এক বন্ধুকে কিছু টাকা হাওলাত দিয়েছিলেন। হাওলাত দেওয়ার সময় সেখানে আবদুল মোনেম উপস্থিত ছিলেন । এটি আবদুল মোনেমের আইএ ফাইনাল পরীক্ষার কিছুদিন আগের ঘটনা।
বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হলেও সে ব্যক্তি টাকা ফেরত দিচ্ছে না। বন্ধুর কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সে আবদুল মোনেমের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
কারণ হিসাবে সে বলে যে টাকা দেওয়ার সময়ে আবদুল মোনেম সেখানে উপস্থিত ছিল। আবদুল মোনেমও তার মায়ের মতই অন্যায়কে কখনও প্রশ্রয় দিতেন না। বিষয়টি নিয়ে মারাত্মক তিক্ততার সৃষ্টি হয়।
তিক্ততা চরম আকার ধারণ করলে রাগারাগী করে লেখাপড়া ছেড়ে আবদুল মোনেম মায়ের হাতের একটি চিঠি এবং ৭০ টাকা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়।
উঠেন এসে ঢাকার উয়ারীর হেয়ার স্ট্রিটের মোসাম্মৎ জেবুন্নেসা মনসুরের বাসায়। অনেক আগে থেকেই আবদুল মোনেম জেবুন্নেসা মনসুরকে বোন এবং তার স্বামী সৈয়দ মোহাম্মদ মনসুরকে দুলাভাই বলে ডাকতেন।
জেবুন্নেসা মনসুর আবদুল মোনেমকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতই আদর ও স্নেহ করতেন। জেবুন্নেসা মনসুরের উয়ারীর বাসায় আবদুল মোনেম আগেও মাঝে মাঝে বেড়াতে এসেছেন।
মোসাম্মৎ জেবুন্নেসা মনসুর হচ্ছেন আবদুল মোনেমের পিতা মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের কলকাতায় শিক্ষা জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাজী মোবারক আলীর মেয়ে।
সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদের বন্ধু কাজী মোবারক আলী শেষ বয়সে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়ায় বসবাস করলেও ঢাকায় বসবাসকারী তার মেয়ে মোসাম্মৎ জেবুন্নেসা ও জামাতা সৈয়দ মোহাম্মদ মনসুরের মাধ্যমে বন্ধুপুত্র আবদুল মোনেমের খবরা খবর রাখতেন।
সৈয়দ মোহাম্মদ মনসুর ও মোসাম্মৎ জেবুন্নেসা দম্পতির ছিল চার সন্তান।
তারা হলেন, ১. মোহাম্মদ পারভেজ, ২.সৈয়দা জিন্নাত মনসুর, ৩.সৈয়দ মোহাম্মদ আলী, ৪. সৈয়দা মোনালিসা মনসুর।
আবদুল মোনেম তাদেরকে নিজের ভাগিনা ও ভাগিনির মতই দেখতেন এবং বাসায় থেকে পড়াতেন। তারাও তাদের নিজের মামার মতই তাকে ভালবাসতো।
আবদুল মোনেমের চাকরি জীবন শুরু:
আবদুল মোনেম ঢাকায় এসে সিএন্ড বি ডিপার্টমেন্টে ওয়ার্ক এসিসেটেন্ট পদের একটি চাকরিতে যোগদান করেন। উয়ারির হেয়ার রোডের মোসাম্মদ জেবুন্নেসার বাসায় আবদুল মোনেম দুই বছর অবস্থান করেন।
পাশাপাশি সিএন্ড বি ডিপার্টমেন্টে তার চাকরিও চলতে থাকে। অবসরে ভাগিনা ও ভাগিনিদেরকে তিনি পড়াতেন।
সুনাম ও দক্ষতার সাথে ওয়ার্ক এসিসেটেন্ট পদে চাকরির শুরু থেকেই তিনি দায়িত্বে অবহেলা, কাজে ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি তার কল্পনাতেও ছিল না। ওয়ার্ক এসিসটেন্ট পদে চাকরিকালে তিনি ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষার সুযোগ পান।
তখনকার সময়ে নিয়ম ছিল যারা ওয়ার্ক এসিসটেন্ট পদ থেকে ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করতেন তাদেরকে সরাসরি সেকশন অফিসার বা ওভারশিয়ার পদে পদোন্নতি দেওয়া হতো। আবদুল মোনেম সেই পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।
যদিও নিয়ম অনুসারে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী আবদুল মোনেম সেকশন অফিসার কিংবা ওভারশিয়ার পদে নিয়োগ লাভ করার কথা কিন্তু কি কারণে জানা নাই, তিনি সে সময়ে সে পদে নিয়োজিত হতে পারেননি।
পরিবর্তে তিনি ঢাকা থেকে সাভার রাস্তার পাশের দৈনিক পানির রেকর্ড রাখার জন্য দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। প্রাপ্ত দায়িত্ব তিনি সঠিকভাবে পালনের অবহেলা করেন নাই।
তাকে দেওয়া সে কাজকে তিনি ছোট মনে না করে সঠিক ভাবে করে যেতে থাকেন। প্রতিদিন তিনি সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাই সাইকেল চালিয়ে গিয়ে ঢাকা-আরিচা রোডে কল্যাণপুর থেকে সাভার পর্যন্ত পানি মাপার কাজ করতেন।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে অংশীদার হিসাবে যোগদানের প্রস্তাব:
নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের কারণে সে সময়ে আবদুল মোনেম সিএন্ডবি বিভাগের বড় ঠিকাদার কেএম সফির নজরে পড়েন। ঠিকাদার কেএম সফি ছিলেন আজকের বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি প্রখ্যাত ফুটবলার কাজী সালাহ উদ্দিনের পিতা।
কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা লক্ষ্য করে ঠিকাদার কেএম সফি আবদুল মোনেমকে বেশ স্নেহ করতেন। তিনি তার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে অংশীদার হিসাবে আবদুল মোনেমকে যোগদান করার প্রস্তাব দেন। কেএম সফির প্রস্তাব নিয়ে আবদুল মোনেম সিএন্ডবি ডিপার্টমেন্টের হিসাব রক্ষক সেকেন্দার আলীর সহিত পরামর্শ করেন।
বলতে গেলে ডিপার্টমেন্টে সেকেন্দার আলী ছিলেন আবদুল মোনেমের অভিভাবক। সেকেন্দার আলীর পরামর্শে আবদুল মোনেম কেএম সফির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে শেয়ারে ঠিকাদারী ব্যবসা আরম্ভ করেন।
এখানে উল্লেখ, সিএন্ডবি ডিপার্টমেন্টের সদর দপ্তরে আবদুল মোনেমের অভিভাবক সেকেন্দার আলী ছিলেন আলমগীর পিকচার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের পিতা।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের পিতা সেকেন্দার আলী আবদুল মোনেমকে তার আরেক ছেলের মতই স্নেহ করতেন,ভালবাসতেন এবং নানাভাবে সকল কাজে সহযোগিতা করতেন।
ঠিকাদারী কাজে তাকে প্রয়োজনে তিনি অর্থ সহায়তাও করতেন।
সিএন্ডবি ডিপার্টমেন্টের হিসাব রক্ষক সেকেন্দার আলী সাহেব বেশ পরহেজগার মানুষ ছিলেন। তার ছেলে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সিনেমা বানাতেন বিধায় তিনি তার ছেলেকে তিরস্কার করতেন।
ছেলেকে সিনেমার জগৎ থেকে ফেরানোর অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পিতার কথার অবাধ্য হওয়ায় মনের দুঃখে তিনি তার সকল বিষয় সম্পত্তি পুত্রবৎ আবদুল মোনেমকে লিখে দিয়েছিলেন। অবশ্য আবদুল মোনেম তাকে প্রদত্ত বিষয় সম্পত্তি সেকেন্দার আলী সাহেবকে বিধিমতে আবার ফেরৎ দিয়ে দেন।
গুলিস্তানের রেক্স হোটেল, অস্থায়ী ঠিকাদারী অফিস:
অংশীদার হিসাবে কেএম সফির সাথে দুই বছরের অধিক সময় ঠিকাদারী ব্যবসা চালিয়ে যান। ব্যবসায়ের অংশীদার হিসাবে আবদুল মোনেম সমস্ত কাজ নিজে তদারক করতেন। অফিসের সাথে তিনিই যোগাযোগ করতেন।
বিল তৈরি করা, কাজ নেওয়া ইত্যাদি কাজের দায়িত্ব তিনিই পালন করতেন। কেএম সফি সাহেব এক সময়ে নিজের ব্যবসা ঘোষণা দিয়ে গুটিয়ে ফেলেন। তখন আবদুল মোনেম এককভাবে কাজ চালাতে গিয়ে অফিস সংকটে পড়েন।
তখন রেক্স হোটেল নামে গুলিস্তানে একটি ভাল হোটেল ছিল। সে হোটেলের কোণায় এক টেবিলে তিনি নিয়মিত বসতেন এবং ঠিকাদারী কাজগুলি সেখানে বসে বসে সম্পাদন করতেন।
সে হোটেলে পরোটা, মামলেট, কাবাব ইত্যাদির বেশ নাম ছিল। আবদুল মোনেম যে টেবিলে বসে কাজ করতেন সে টেবিলে তার লোকজন আসার কারণে প্রত্যেকদিন ৬০/৭০ টাকা বিল হতো। সে কারণে হোটেল মালিক অফিসের কাজ করাতে কোনো আপত্তি করতেন না।
১৯৫৬ সালে এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গঠন:
ঠিকাদার কেএম সফি তার ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরে সেকেন্দার আলী সাহেবের পরামর্শে আবদুল মোনেম নিজ নামে ১৯৫৬ সালে এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গঠন করেন। মাত্র ২০(কুড়ি) হাজার টাকা নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু বরেন।
প্রথমে ছোট ছোট কাজ করা আরম্ভ করেন। প্রথম দিকে ছিল ইট, সিমেন্ট, রড,কয়লা ইত্যাদি পরিবহণের কাজ। তারপর আস্তে আস্তে ছোট ছোট নির্মাণ কাজ শুরু করেন। সিএন্ডবি অফিসের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কাছে সৎ ও ভাল চরিত্রের এবং কর্মঠ হিসাবে আবদুল মোনেমের পরিচিতি ছিল।
সিএন্ডবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী সফি উল্লাহর সুনজরে ছিলেন তিনি।
নির্বাহী প্রকৌশলী সফিউল্লাহর সহযোগিতা লাভ:
কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাস করা এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার সফিউল্লাহ ছিলেন আবদুল মোনেমের প্রতি স্নেহশীল। নির্বাহী প্রকৌশলী সফিউল্লাহর বাড়ি ছিল চাঁদপুরে। তার পিতা চাঁদপুরে বড় পাটের ব্যবসায়ী ছিলেন।
অফিসের নানা কাজে নির্বাহী প্রকৌশলী সফিউল্লাহ আবদুল মোনেমকে খুব সহযোগিতা করতেন। ওদিকে অফিসের কাজে সব সময় তার সহযোগিতায় ছিলেন হিসাব রক্ষক সেকেন্দার আলী।
আবদুল মোনেমের এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সফলতার পেছনে এই দু’জনের অবদান ছিল অপরিসীম।
আবদুল মোনেমের বিয়ে:
ঢাকার উয়ারির হেয়ার রোডে মোসাম্মৎ জেবুন্নেসা মনসুরের বাসায় অবস্থান কালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার তারাগঞ্জ গ্রামের আবু নাছের মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া ও আফিয়া খাতুন দম্পতির কন্যা মোসাম্মৎ মেহেরুন্নেসার সাথে ১৯৬২ সালে আবদুল মোনেমের বিয়ে হয়।
আবদুল মোনেমের বিবাহের পর স্ত্রী মোসাম্মৎ মেহেরুন্নেসা ও মাতা হোসনা বানুকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তিনি আরামবাগে একটি টিনের ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে উঠে পড়েন।
আরামবাগের বাসায় থাকা অবস্থায় আবদুল মোনেম ও মেহেরুন্নেসা দম্পতির প্রথম সন্তান দিলারা বেগম ও দ্বিতীয় সন্তান মাহমুদা বেগমের জন্ম হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও মেহেরুন্নেসার মাতাপিতার মৃত্যু:
বিয়ের পর থেকে মেহেরুন্নেসাকে তার পিতা ও মাতা সার্বিক ভাবে সাংসারিক কাজে নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছিলেন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ৬ই মে তারাগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানী সেনারা গুলি করে আরও দুজন প্রতিবেশির সাথে আবু নাছের মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া ও আফিয়া খাতুনকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।
মাতা পিতা একই সাথে শহীদ হওয়ার খবরে মেহেরুন্নেসা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। সে সময়ে তার কনিষ্ঠ বোন কেবল ৬/৭ বছরের শিশু।
কনিষ্ঠ বোন সামছুন্নাহার স্বপ্না হঠাৎ এতিম হয়ে পড়ায় মেহেরুন্নেসা তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। তিনি তার সন্তানদের সাথে মানুষ করেন।
লেখাপড়া শেষ করার পর নিজ দায়িত্বে ডাক্তার ডি এম আমানুল হক নামক জনৈক পাত্রের সাথে সামছুন্নাহার স্বপ্নার বিয়ে দেন। মোসাম্মৎ মেহেরুন্নেসা ইচ্ছায় মাতাপিতার কবরের পাশে একটি মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
লেক সার্কাস কলাবাগানে এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অফিস:
আবদুল মোনেম ১৭/১ লেক সার্কাস কলা বাগান এলাকায় একখন্ড জমি ক্রয় করেন। সেখানে তিনি একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। নিচ তলায় এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অফিস এবং দোতলায় বসবাস করা আরম্ভ করেন। ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বাড়তে থাকে।
স্থান সংকুলান না হওয়ায় তিনি উত্তর ধানমন্ডিতে একটি জায়গা ক্রয় করেন।
এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ধানমন্ডি অফিস:
আবদুল মোনেম ৯/এ, উত্তর ধানমন্ডি এলাকায় তার ক্রয়কৃত জায়গায় একটি ৬-তলা ভবন নির্মাণ করেন। প্রথম দিকে ভবনের নিচতলা পরে দোতলায় অফিস স্থাপন করেন।
বাকি তলাতে মেহেরুন্নেসার ভাই মোহাম্মদ মাহমুদ, বড় মেয়ে দিলারা বেগম রিংকু, বড় বোন মোসাম্মৎ নাছিমা খাতুন মিনা এবং ছোট বোন বেগম সামছুন্নাহার স্বপ্নাসহ সবাইকে নিয়ে বসবাস করেন।
গুলশান এভিনিউতে জমি ক্রয় ও বাসা তৈরি:
১৯৯৫ সালে ৪নং গুলশান এভিনিউতে এক বিঘার একটি প্লট ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণ করে সপরিবারে বসবাস করা আরম্ভ করেন। অদ্যাবদি সেখানেই তার পরিবারের বসবাস।
ওদিকে লেক সার্কাস কলাবাগানের বাড়িতে অফিসের স্থান সংকুলানের অভাবে ২০০০ সালে হোটেল শাহবাগে অবস্থিত হীরা জুয়েলার্সের মালিক আলী আকবরের রমনা এলাকার একখন্ড জমি ৭ বৎসরের জন্য ভাড়া নেন এবং নিজ খরচে একটি দোতলা স্টিল স্ট্রাকচারের ইমারত তৈরি করে লেক সার্কাস কলাবাগান থেকে অফিস স্থানান্তর করে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেখানে অফিস চালু রাখেন।
২০০১ সালে ১১১ বীর উত্তম সিআর দত্ত সোনারগাঁও রোড, ঢাকায় নিজস্ব জমি ক্রয় করে বাণিজ্যিক ইমারত নির্মাণ কাজ আরম্ভ করেছিলেন। ২০০৭ সালে নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলায় এএমএল এর অফিস করা শুরু করেন।
ইমারতের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হলে ২০০৯ সালে ভবনের ১৪ তলার ৩৭০০০বর্গফুট এলাকা নিয়ে করপোরেট অফিস হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করেন। এখন এএমএল group-এর প্রধান কার্যালয় হিসাবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
এএমএল group-এর বাণিজ্যিক তৎপরত: দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এএমএল কনস্ট্রাকশন।
এএমএল কনস্ট্রাকশন দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো বড় ও সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা ও যথাসময়ে সরবরাহের বিষয়ে শুরু থেকেই সুনাম অর্জন করে কোম্পানিটি। শুরুতে তার ব্যবসার কোনো চলতি মূলধন ছিল না। তবে সেরাটা করার স্বপ্ন, সঙ্গে সততা ও নিষ্ঠাই তাকে মূলধনের সংকট উৎড়াতে সাহায্য করেছে।
জীবনের এই অমূল্য পূঁজির ওপর ভর করে ১৯৫৬সালে শুরু হওয়া আবদুল মোনেমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প group-এ পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছে groupটি।
পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, বিভিন্ন সেতু নির্মাণ, জয়দেবপুর-এলেঙ্গা মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ, ৪৪ কিলোমিটার দৈর্ঘের খুলনা-মোংলা হাইওয়ে নির্মাণ, ৪২ কিলোমিটার দৈর্ঘের ভাটিয়াপাড়া-গোপালগঞ্জ-মোল্লাহাট সড়ক, গড়াই সেতু, মাওনা সেতু, গুলশান-বনানী সেতু, বনানী ফ্লাইওভার, লালন সেতুর এপ্রোচ সড়ক, চট্টগ্রাম-ককসবাজার, পাবনায় সড়কসহ অসংখ্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেছে আবদুল মোনেম কনস্ট্রাকশনস। আবদুল মোনেম কনস্ট্রাকশন এর নির্মাণ কাজের তালিকা অনেক বড়।
কেবল রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণই নয়, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন, ত্রিবেণী নামে পরিচিত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এসএম বারাক অ্যান্ড দামাল কোট নির্মাণ, গাবতলী, মহাখালী ও সায়দাবাস বাস টার্মিনাল নির্মাণ করেছে আবদুল মোনেম কনস্ট্রাকশন।
পর্যায়ক্রমে তার ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে হতে এএমএল মাল্টি ডিসিপ্লিনারি বিজনেস group-এ রূপ নেয়। যে সকল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এএমএল group-এর কর্মপরিধি বৃদ্ধি করেছেন সেগুলির মধ্যে প্রধান প্রধান গুলো হলো:
১. আবদুল মোনেম লিমিটেড
২. এএম সুগার রিফাইনারী লিমিটেড
৩. ইগলু ফুডস লিমিটেড
৪. এএম সিকিউরিটিস এন্ড এফএস লিমিটেড
৫. এএম এনার্জি রিমিটেড
৬. ইগলু আইস ক্রিম লিমিটেড
৭. নোভাস ফার্মা লিমিটেড
৮. ইগলু ডেইরি লিমিটেড
৯. এএম চ্যানেল লিমিটেড
১০. এএম অটো ব্রিকস লিমিটেড
১১. ডেনিস-বাংলা ইমালশন লিমিটেড(জেভি)
১২. এএম ব্রান ওয়েল কোম্পানি লিমিটেড(জেভি)
১৩. এএম এসফল্ট এন্ড আরএমসি লিমিটেড
১৪. আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোন লিমিটেড
১৫. এএম বেভারেজ
১৬. এএমইজেড পাওয়ার লিমিটেডসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
নির্মাণ খাতের মত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলেও তার ব্যবসায়িক মতাদর্শ কখনো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়নি। সব দল, সব সরকারের সাথেই তার সুসম্পর্ক ছিল, সব সরকারের আমলেই দেশের জন্য তিনি অবদান রেখেছেন এবং তার কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন।
ব্যবসা শুরু করার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়েছে, বারবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্ত এসব কিছুই আবদুল মোনেমের ব্যবসায়িক মতাদর্শকে প্রভাবিত করতে পারেনি।
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চর বাউশিয়ায় আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বর্তমানে এ group-এ প্রায় ১০ হাজারের অধিক দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।
এএমএল কনস্ট্রাকশন আবদুল মোনেম group-এর সবচেয়ে বড় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।
বেসরকারি খাতে শিল্পস্থাপন, পণ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে আবদুল মোনেম লিমেটেড (এএমএল)। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘রাষ্ট্রপতি শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার ছাড়াও বৃহৎ শিল্প বিভাগ ও হাইটেক বিভাগে প্রতিষ্ঠানটি পুরস্কার অর্জনসহ নানা পুরস্কার লাভ করেছে।
তিনি দেশের সেরা শিল্পপতিদের একজন এবং বিজনেস টাইকুন হিসাবে পরিচিত।
‘টাচিং লাইভস, বিল্ডিং ক্যাপাবিলিটিস’-এ স্লোগান নিয়ে দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেশ ও সমাজের জন্য বিভিন্ন সেবামূলক কাজও করছে তারা।
আবদুল মোনেম ফাউন্ডেশন থেকে সামাজিক কাজে অবদান:
ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের গরীব ও অসহায় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন আবদুল মোনেম ফাউন্ডেশন।
উক্ত ফাউন্ডেশন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বর গ্রামে প্রায় ৫২ একর জমি দান করে যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে আবদুল মোনেম হাই স্কুল, আবদুল মোনেম কলেজ, মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
এছাড়াও এই ফাউন্ডেশন একটি এতিমখানা পরিচালনা ও সমস্ত খরচ বহন করেছেন। দেশে বন্যা বা অন্য কোনও ধরনের দুর্যোগের সময় এই ফাউন্ডেশন হতে ত্রাণ বিতরণ ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে আবদুল মোনেমের অবদান:
আবদুল মোনেম ছিলেন একজন ক্রীড়ামোদী মানুষ। পুরোদস্তর ব্যবসায়ী হয়েও তিনি খেলাধুলায় অনেক সময় দিতেন। বাংলাদেশে ফুটবলের যখন জোয়ার সেই আশি ও নব্বই দশকে যখন চির প্রতিদ্বন্দ্বী মোহমেডান ও আবাহনী ক্লাবের খেলা ঢাকা স্টেডিয়াম আজকের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতো তখন মোহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়ারগণ সেসব দিনগুলিতে মাঠে আবদুল মোনেমকে না দেখলে মোহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়ারগণ খেলায় জোর পেতেন না।
যেদিন খেলা হতো সেদিন সব কাজ ফেলে দিয়ে হলেও সকালে আবদুল মোনেম খেলোয়ারদের সাথে এসে নাস্তা করতেন। তিনি খেলোয়ারদেরকে সাহস দিতেন। বলতেন সাহস হারানো চলবে না।
খেলায় টিম জিতুক আর নাই জিতুক আবদুল মোনেম খেলোয়াদেরকে পুরস্কৃত করতেন। যে খেলোয়ার গোল করতেন তার থাকতো আলাদা পুরস্কার।
১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম পর্যন্ত আবদুল মোনেম মোহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। তার সভাপতিত্বকালে মোহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব হ্যাট্রিক শিরোপা জিতেছিল।
আবদুল মোনেমের স্ত্রী মেহেরুন্নেসা রত্নগর্ভা মা উপাধিতে ভূষিত:
নিজের পড়াশুনা মাধ্যমিক পেরুতেই তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন স্বামীর বাড়ি। স্বামী, সংসার, শ্বশুরবাড়ি সংশ্লিষ্ট সম্পর্কগুলোকে সঠিক ভাবে বুঝতে না বুঝতেই প্রথম সন্তানের মা হলেন মেহেরুন্নেসা। একে একে তিনি পাঁচজন সন্তানের জননী হলেন।
সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল অতুলনীয়। ছেলেমেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে মা মেহেরুন্নেসা নিজেকে হাসিমুখে উৎসর্গ করেছেন।
নিজের প্রতিভা থাকার পরেও ক্লান্তি, শ্রান্তি স্বীকার করে নিজের সুখ ও শখকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদেরকে নিয়ে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়।
আজ তাদের সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত। ঢাকার আজাদ প্রোডাক্টস হতে তাঁকে ২০১৭ সালে ‘রত্না গর্ভা মা’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে।
আবদুল মোনেম ও মেহেরুন্নেসা দম্পতির সন্তানগণ হলেন-
১. দিলারা বেগম- এম, এসসি(গার্হস্থ অর্থনীতি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি নারী উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিয়োজিত।
২. মাহমুদা বেগম-বি, এসসি(ইঞ্জিনিয়ারিং) বুয়েট। প্রবাসী।
৩. এএসএম মাঈনউদ্দিন মোনেম-এমবিএ,হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা, ব্যবসায়ী।
৪. এএসএম মহি উদ্দিন মোনেম-এম,এসসি(ইঞ্জিনিয়ারিং),বোস্টন, আমেরিকা, ব্যবসায়ী।
৫. ফারহানা মোনেম-এমবিবিএস, ব্যবসা।
আবদুল মোনেমের প্রয়াণ:
আবদুল মোনেম দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভোগছিলেন। ২০১৩সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবদুল মোনেমের মমতাময়ী মা হোসনা বানু বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন।
২০১৬ সালের ২৯শে নভেম্বর থেকেই আবদুল মোনেম ডায়ালাইসিসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এদিকে ২০১৭ সালের ১০ই অক্টোবর বাসায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে তার পায়ে তিনি মারাত্মক আঘাত প্রাপ্ত হন।
শারীরিক নানা সমস্যা নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০২০ সালে ১৭ইমে তারিখে হঠাৎ তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন থাকাকালে ৩১শে মে আবদুল মোনেম ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃতদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে সমাহিত করা হয়।
আবদুল মোনেমের অবর্তমানে এএমএল group পরিচালনা:
বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী আবদুল মোনেম লিমিটেডের (এএমএল) প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মোনেমের অবর্তমানে তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা এএমএল group-এর চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ খালি রয়েছে।
আবদুল মোনেমের বড় ছেলে এএসএম মাঈনউদ্দিন মোনেম উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)-১ এবং এএসএম মহি উদ্দিন মোনেম উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)-২ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আবদুল মোনেম জীবিত থাকা অবস্থায়ই তার ছেলে মাঈনুদ্দিন মোনেম ও মহিউদ্দিন মোনেম দীর্ঘদিন এএমএল group-এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাগাভাগি করে দেখাশোনা করে আসছিলেন।
পিতার অবর্তমানে মায়ের পরামর্শ আর বাবার তৈরি করা নীতি-সততা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় মেনেই শিল্প-বাণিজ্যের জগতে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এএমএল group পরিচালনা করে চলেছেন তাদের কৃতী দু’ছেলে।
☘️আজ ৩১মে হাজী আবদুল মোনেমের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে। এ লক্ষে Igloo Co.Limited-এর উদ্যেগে মরহুমের জন্য দুআ-মিলাদ-আসতাগফারসহ সওয়াব রেসানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।✳️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post র‌্যাবের বদলী
Next post কিশোরগঞ্জে দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি হাজী আঃ মোনেমের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত।। আয়োজনেঃ মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স।।